‘ডিম ছাইরযি-রে, ডিম ছাইরযি-রে’

  • Emad Buppy
  • May 12, 2014
  • Comments Off on ‘ডিম ছাইরযি-রে, ডিম ছাইরযি-রে’
Halda_river
হালদা নদী
পুরুষেরা নদীতে বড় নৌকায় বড় জালে, কিনারে হাত জালে নারী-শিশু সকলেই ব্যস্ত ডিম ধরায়। মদুনাঘাট, রাম দাশ মুন্সীর হাট, গড়দুয়ারা, রাউজানের কাগতিয়া, মোবারকখীল ও সংগ্রহ করছেন তিন শতাধিক ডিম আাহরণকারী।

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ বন্দর নগরীতে স্বস্তির বদলে ভোগান্তিই দিয়েছে বেশি। জলাবদ্ধতায় প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম শহরের জীবন। তবে ওই টানা বর্ষণে ঠিক উল্টোটিই ঘটছে হাটহাজারীর মদুনাঘাট, রাম দাশ মুন্সীর হাট, গড়দুয়ারা, রাউজানের কাগতিয়া, মোবারকখীল ও গহিরাসহ বিভিন্ন এলাকায়। ‘রুপালী সম্পদের মা’ খ্যাত হালদা অববাহিকার মানুষের মাছে ভোর রাতে টিপটিপ বৃষ্টি সাথেই ‘নেমে এসেছে’ আনন্দ সংবাদ, ‘ডিম ছাইরযি-রে, ডিম ছাইরযি-রে ’ ।

সোমবার সকাল থেকেই এমন হাক ডাকে মেতে আছে হালদার পাড়। ভোরে প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল নামতে শুরু করলে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস মা মাছ ডিম ছাড়তে শুরু করেছে এশিয়ার একমাত্র রুই জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতে।

পুরুষেরা নদীতে বড় নৌকায় বড় জালে, কিনারে হাত জালে নারী-শিশু সকলেই ব্যস্ত ডিম ধরায়। মদুনাঘাট, রাম দাশ মুন্সীর হাট, গড়দুয়ারা, রাউজানের কাগতিয়া, মোবারকখীল ও সংগ্রহ করছেন তিন শতাধিক ডিম আাহরণকারী। ডিম সংগ্রহের জন্য তারা ওই এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে জাল ফেলেছেন।

গতকাল রোববার প্রবল বর্ষণের পর বিকালে মা মাছ রাম দাশ মুন্সীর হাট এলাকায় নমুনা ডিম ছাড়ে। নমুনা ডিম ছাড়ার পর দীর্ঘসময় ধরে প্রতিক্ষায় থাকা মৎসজীবী ও আহরণকারীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে ডিম সংগ্রহে ও তা সংরক্ষণে।

এছাড়া, উপজেলা মৎস্য বিভাগ ডিম ফুটানোর জন্য হাটহাজারী এলাকায় মদুনাঘাট শাহ মাদারী, মাছুয়াগোনা ও গড়দুয়ারা এবং রাউজানের কাগতিয়া, মোবারকখীল ও পশ্চিম গহিরার পাঁচটি হ্যাচারি প্রস্তুত রয়েছে। যাতে মা মাছ ডিম ছাড়ার সাথে সাথে হ্যাচারিতে এনে ডিম ফুটাতে পারে।

সাধারণত মা মাছ চৈত্র থেকে বৈশাখ মাসে আমাবস্যা, পূর্ণিমা ও অষ্টম তিথিতে প্রবল পাহাড়ি ঢলে নদীতে ডিম ছাড়ে। গত কয়েকদিন হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকায় বজ্রসহ প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর ফলে রোববার রাতে পাহাড়ি ঢলের তোড় বৃদ্ধি পেলে মা মাছ হালদা নদীতে ডিম ছাড়তে শুরু করে।

সংগৃহীত ডিম দেখাচ্ছেন এক সংগ্রহকারী
সংগৃহীত ডিম দেখাচ্ছেন এক সংগ্রহকারী

হাটহাজারী গড়দুয়া এলাকার ডিম সংগ্রহকারী শাহেদ উদ্দিন জানান, ডিম ছাড়ার আশায় তারা গেল এক মাস ধরেই অপেক্ষা করছেন। কিন্তু বৃষ্টিপাত পর্যাপ্ত না হওয়ায় মা রুই ডিম ছাড়েনি। তবে রোববার থেকে টানা বর্ষণে নদীতে ‘ঢল’ নেমেছে। মাছও এবার ডিম ছেড়েছে বেশি।

ডিম সংগ্রহ

ডিম ছাড়ার সাথে সাথে ডিম সংগ্রহকারীরা মশারির নেট দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি একধরণের জাল পেতে ডিম তুলে নেন নৌকায়। তার আগে নৌকার খোলের মধ্যাংশে তক্তা ও মাটি দিয়ে কৃত্রিম পুকুরের মত তৈরি করা হয়। এ গর্তে সূতির কাপড় দিয়ে ডিম রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ডিম ধরার পর নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাটির তৈরি এক ধরণের বিশেষ অগভীর কুয়ায় এগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া সরকারিভাবে তৈরিকৃত হ্যাচারিতেও ডিম ছাড়েন সংগ্রহকারীরা। ডিমকে কুয়া কিংবা হ্যাচারিতে ছাড়ার পর এগুলো পরিস্ফুটন করা হয়।

প্রসঙ্গত বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে হালদা নদীর পরিবেশগত বিশেষ পার্থক্য থাকায় বর্ষা মৌসুমে এখানে রুই জাতীয় মা মাছ ডিম ছাড়তে আসে। অমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে বজ্রসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত, উজানের পাহাড়ি ঢল, তীব্র স্রোত, ফেনিল ঘোলা পানিসহ নদীর ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বিত ক্রিয়ায় হালদা নদীতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে রুই জাতীয় মাছকে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে। আর এ সময় বিভিন্ন নদী থেকে মাতৃত্বের টানে ছুটে আসে মেজর কার্পস বা রুই জাতীয় মাছ।

এদিকে দুবৃত্তরা যাতে ডিম লুটে নিতে না পারে এবং মা মাছ ধরতে না পারে সেজন্য চট্টগ্রামের রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলার প্রায় ২০ কিলোমিটার অংশে পাহারাও বসিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। সবকিছু অনুকুলে থাকলে এবার দুই হাজার কেজি পর্যন্ত ডিম  আহরণ করা সম্ভব হতে পারে বলে ধারণা করছেন হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন।