আসন্ন বাজেট : যে প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের

  • Emad Buppy
  • May 9, 2014
  • Comments Off on আসন্ন বাজেট : যে প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের
বাজেট ২০১৪-১৫
বাজেট ২০১৪-১৫
বাজেট ২০১৪-১৫

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, স্থায়ী সরকার ও নীতি, পোশাক শিল্প থেকে বিদেশিদের কিছুটা পিছুটানসহ নানান সমস্যার কারণে চলতি অর্থবছরটি ভালো কাটেনি ব্যবসায়ীদের। তাই নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় আস্থাশীল পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব একটি বাজেটের প্রত্যাশা তাদের। সেই সাথে গত বছরের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে কিছু কিছু খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ও বিশেষ প্রণোদনা চায় তারা।

আর এ লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও এসোসিয়েশেনের সাথে আলোচনা করে সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই)। ব্যবসায়ীদের চহিদা অনুযায়ী এফবিসিসিআই শিল্প-কারখানার জন্য ব্যাংকে সুদের হার কমানো, আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসে ৬১৭টি প্রস্তাব দেয়। এছাড়াও বাজেটকে শিল্প ও বিনিয়োগ-বান্ধব করতে খাতভিত্তিক বেশ কিছু দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী এফবিসিসিআইয়ের দেওয়া উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো-

এডিপি বাস্তবায়ন : বর্তমান অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এডিপির লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩৮ শতাংশ বাস্তবায়ন হওয়ায় থমকে গেছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। তারপরও আগামি বাজেটে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। তবে এডিপি বাস্তবায়নের জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সহায়ক এডিপি এবং এর আয়তন বাস্তবায়নযোগ্য সীমায় নিয়ে আসতে হবে।

বিনিয়োগ : দুর্বল অবকাঠোমোর কারণে চলতি অর্থবছরে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ কমেছে জিডিপির ১ শতাংশ। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এবং কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে জিডিপির ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আর এ জন্য ব্যাংক সুদের স্প্রেড (আমানত ও ঋণের সুদ হারের ব্যবধান) ৩ শতাংশের ও সুদের হার ১২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি : চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ না থাকায় নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি উৎপাদনে যেতে পারছে না। তাই শিল্প উদ্যোক্তাদের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করার অনুরোধ করা হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ছাড়াও পুরাতন ও বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসমূহকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় এনে পুনরায় চালু করার দাবি জানানো হয়।

বেসরকারি খাতের লোকসানি শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনর্বাসন :  বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বাজেটে থোক বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করছি। পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের স্বার্থে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

কৃষি উৎপাদন : বর্তমানে কৃষি খাতে ভর্তুকি শতকরা ১ শতাংশেরও নিচে। অথচ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার কৃষি চুক্তির অধীনে কৃষি খাতের জিডিপির ১০ শতাংশ কৃষি ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তাই এ খাতে ভর্তুকি না কমিয়ে সাধ্যমতো বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। একই সাথে ভর্তুকি যাতে সরাসরি ও সঠিক সময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে সে বিষয়ে মনিটরিং জোরদার ও সকল কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরিমাণ কৃষি ঋণ প্রদান করার আহ্বান জানানো হয়।

পর্যটন শিল্পের বিকাশ : সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে পর্যটন শিল্পের বিকাশে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটকদের জন্য শুল্কমুক্ত বাস ও গাড়ি আমদানির প্রস্তাব করা হয়।

পুঁজিবাজার উন্নয়ন : দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নে স্টক এক্সচেঞ্জগুলিকে আইপিওর আওতায় আনার পাশাপাশি ক্লিয়ারিং হাউজ কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা, ডেরিভেটিভস মার্কেট চালু, কমোডিটি মার্কেট চালু এবং নেটিং সিস্টেম চালু করার প্রস্তাব করা হয়।

দ্রব্যমূল্য : রমজানকে সামনে রেখে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য নিত্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।  প্রয়োজনে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন : ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহজতর করতে রাস্তা-ঘাট, বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়নসহ অবকাঠামোগত সকল ধরনের উন্নয়ন অত্যান্ত জরুরি। এক্ষেত্রে পিপিপিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

আমদানি শুল্ক: পোশাকখাতে বিদেশি ক্রেতাদের কারখানার অবকাঠামোগত উন্নয়ন চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান সংকটের সম্মুখীন। এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মূলধনী যন্ত্রপাতির কাঁচামালের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক বিনা শর্তে ১ শতাংশ, মধ্যবর্তী কাঁচামালের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ, দেশে উৎপাদিত মধ্যবর্তী কাঁচামাল ও অতিপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ১০ শতাংশ এবং বিলাস জাতীয় ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে রেগুলেটরি ডিউটিসহ ২৫% শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়।

স্থানীয় শিল্পের বৈষম্যহীন প্রতিরক্ষণ নীতিমালা প্রবর্তন ও ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য ও আমদানিকৃত তৈরি পণ্যের মধ্যে মোট করের পার্থক্য অনধিক ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।

মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট: জাতীয় স্বার্থে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প খাতকে করবান্ধব করতে চীন, জাপান ইউরোপসহ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে অনুসৃত মূসক পদ্ধতির আলোকে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২ যথাযথভাবে সংশোধন করা।
দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের স্বার্থে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উৎসাহিত করতে এবং স্থানীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় আনার জন্য উৎপাদনের স্তরে সকল খাতে আরোপিত সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা।

এক কোটি টাকা পর্যন্ত শূন্য হারে এবং এক কোটি টাকা হতে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভারের ওপর দুই শতাংশ হারে টার্নওভার কর ধার্য করা।
দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ভ্যাট দিতে এগিয়ে আসছে। তাই তাদেরকে ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্যাকেজ ভ্যাট সুবিধা প্রদান করা দরকার।
সুপার স্টোরগুলোর ক্ষেত্রে আরোপিত ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ মূল্য সংযোজন হিসেবে দুই শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। সে হিসেবে আমদানি পর্যায়ে একই হারে মূসক ধার্য করা।
জ্বালানি, বিদুৎ, ব্যাংকিং ও পরিবহন এ কয়েকটি হচ্ছে জাতীয় উন্নয়নে অর্থনীতির মৌলিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ কয়েকটি খাতের সেবার ওপর দেশের সমগ্র অর্থনীতি নির্ভর করে। সুতরাং এ কয়েকটি খাতকে মূসকের বহির্ভূত রাখার দাবি জানায় সংগঠনটি।

আয়কর : ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি, জীবন যাত্রার ব্যয়, দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জনগণের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার, নারী কর দাতাদের ক্ষেত্রে ২ লাখ ৭৫ হাজার এবং প্রতিবন্ধী করদাতার ক্ষেত্রে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।
এশিয়ার অন্যান্যা দেশের ন্যায় বিনিয়োগের সুযোগে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কর্পোরেট কর সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।

এছাড়া, কোম্পানির লাভ-ক্ষতি নির্বিশেষে মোট প্রাপ্তির দশমিক ৫০ শতাংশ সর্বোচ্চ কর বিধান সম্পূর্ণ প্রত্যাহার বা কমিয়ে দশমিক ২৫ শতাংশ করা। আর এনজিও খাত, বিশেষ করে তাদের পরিচালিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে করের আওতায় আনা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণ : অর্থনৈতিক উন্নয়ন সক্রিয় করার লক্ষ্যে টেলি কমিউনিকেশন রেগুলেটরি বোর্ড, এনার্জি রেগুলেটরি বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন, বিনিয়োগ বোর্ড, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রভৃতিকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও শক্তিশালী করার দাবি জানানো হয়।

রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্য ও গবেষণা শাখার উন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিশ্চিতকরণ, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিশেষ চাকরি বিধি, বেতন-ভাতা কাঠামো ও সুযোগ সুবিধা আকর্ষণীয় করার পাশাপাশি তাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডে জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি।

ন্যায় বিচার ও স্বচ্ছতা : সুশাসন ও ন্যায় বিচারে স্বার্থে সরকারের সকল স্তরের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার জন্য প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত ভূমিকা আরও জোরদার করার প্রস্তাব করা হয়।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগে আস্থা : ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবনায় বলা হয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হচ্ছে রাজনৈতিকি স্থিতিশীলতা। চলতি বছরের অস্থিতিশীলতায় ধস নেমেছে ব্যবসা ও বিনিয়োগে। বর্তমানেও বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি আস্থার পরিবেশ ফিরে পায়নি। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে নিয়ে আসার দাবি তাদের।

তাছাড়া পোশাক শিল্পসহ গুরুত্ব কয়েকটি ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের নেতিবাচক মনোভাব দূর করে দেশকে ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করার পরিবেশ তৈরির দাবি ব্যবসায়ীদের।

এআর