‘খালা যখন বলে ভাত নাই তখন মাকে মনে পড়ে’

রান প্লাজা

রান প্লাজামা-বাবার স্বপ্ন ছিলো একদিন বিশ্ব জয় করবে তাদের বিজয়।বড় হয়ে হবে মানুষের মতো মানুষ। বিজয় হয়তো মানুষ হবে এক দিন, হবে সফল মানুষ।কিন্তু তা আর দেখার সুযোগ পাবেন না শুভ ইসলাম বিজয়ের মা-বাবা। সেই ভয়াল ২৪ এপ্রিল তারা চলে গেছেন না ফেরার দেশে।স্বপ্ন না দেখার দেশে।

২৪ এপ্রিল ২০১৩। সকালে অন্যান্য দিনের মতোই ছেলের ছোট্ট হাত ধরে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে কারখানায় গিয়ে ছিলেন বিজয়ের মা-বাবা সেলিনা বেগম ও শাহাদাত হোসেন শামীম।যাওয়ার আগে বিজয়কে মা বলে গিয়েছিলেন, সন্ধ্যায় ফিরে নিজ হাতে খাইয়ে দেবেন। কোলে বসিয়ে শোনাবেন রুপকথার গল্প।

কিন্তু মা কথা রাখেন নি। এক বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা বিজয়ের মুখে তুলে দেননি এক মুঠো ভাত। বুকে জড়িয়ে ধরে বলেননি তাল  দিঘীর ভোমরার গল্প। মায়ের জন্য মাঝে মাঝে মনটা কেমন কেমন করে ওর। বুকের মধ্যে শুন্য লাগে। বাবার জন্য মন কাঁদে।

ও এখন বোঝে মা-বাবা আর কোনো দিনই ফিরে আসবে না। সেই অভিশপ্ত ২৪ এপ্রিল, অপয়া রানা প্লাজা কেড়ে নিয়েছে তাদের। তারা ওর থেকে অনেক দূরে হারিয়ে গেছেন।

মা-বাবার কথা মনে পড়ে কণ্ঠভারী হয়ে আসা বিজয় বললো, ‘আমার আব্বু-আম্মু আর কোনো দিন আসবে না। আমাকে আদর করবে না।’

তবে আবেগী শিশুর মন মাঝেমাঝে বেঁকে বসে।এমনিতে চুপচাপ থাকা ছেলেটি হঠাৎ হাওমাউ করে কেঁদে ওঠে, ‘আমি আর কিছু চাই না। আমি শুধু আমার আব্বু-আম্মুকে ফিরে পেতে চাই।’

তখন ওকে আর মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া যায় না। সংবাদকর্মীদের দেখলে সে কাতর কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘বলেন না সার; আমি আম্মুকে দেখতে পাবো? মা আবার এসে আমাকে আদর করবে। মায়ের জন্য খুব পরান পুড়ছে’।

বিজয় জানায়, ওই দিন টিভিতে তার মাকে দেখতে পেয়েছিল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সাদা গাড়িতে করে। মা পানি পানি করে চিৎকার করেছিলো। তবে শুনেছি পানি
পাওয়ার আগে আমার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়’।

জানা যায়, বিজয়ের মা সেলিনা বেগম ও বাবা শাহাদাত হোসেন শামীম ফ্যান্টম অ্যাপারেলসে কাজ করতো। তাদের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে। কাজের সন্ধানে সাভারের রানা প্লাজায় এসে কাজ নেয় দুই জনে। সেলিনা ফ্যান্টমের সুইং ডিপার্টমেন্টে অপারেটর হিসাবে কাজ করতো।

বিজয়ের নানী জানান, বাবা-মা মরার পর থেকে বিজয় যেন কেমন হয়ে গেছে। স্কুল থেকে এসে কিংবা অন্য কোথাও থেকে এসে মন খারাপ করে বসে থাকে ছেলেটা। প্রথম প্রথম বেশ কান্না কাটি করতো। বিভিন্ন বিষয়ে জিদ করতো। তবে মা-বাবাকে না পাওয়ার বেদনায় কেমন যেন হয়ে গেছে সে।

ছোট খালা সংসারে থাকে বিজয়। সেও পোশাক কারখানায় কাজ করে। বিজয়ের নানী অভিযোগ করে বলেন, তার দাদারা বিজয়ের কোনো খোঁজ নেয় না। বাবার জন্য যে সহায়তা পেয়েছেন তা বিজয়কে না দিয়ে দাদার পরিবার খেয়ে ফেলছে। বিজয় শুধু মায়ের ক্ষতিপূরণের (তিন বারের মোট ৪৫ হাজার) টাকাই বিকাশের মাধ্যমে পেয়েছে।

দিন বদলের ধারাবাহিকতায় এক বছরে মা-বাবার শোক কিছুটা কমলেও মাঝেমাঝে কষ্ট হয় ভাতের জন্য। স্কুল থেকে এসে কাছে ভাত চাইলে বেশিরভাগ সময়ে খালা বলেন, ‘ভাত নাই, রান্না করিনি। এখন যা।’

ছোট্ট বিজয় বোঝে খালার সংসারেও টানাটানি। সেও যে তার মায়ের মতোই সামান্য এক পোশাক শ্রমিক। আর তারানা প্লাজাই হয়তো ভাত না পেয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে যায় সে। তখন শুধু মায়ের কথা মনে পড়ে। চোখের কোণে জমে ওঠে উষ্ণ জল।

২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের পর এভাবে হারিয়ে গেছে বহু বিজয়ের বাবা-মা। আবার সন্তানহারা হয়েছেন অনেক মা-বাবা। স্বামীহারা হয়েছেন বহুনারী শ্রমিক।

সে সময়  স্বজনহারাদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠেছিল সাভারের রানা প্লাজা, এনাম মেডিকেল কিংবা অধরচন্দ্র বিদ্যালয়ের মাঠ। স্বজনদের কান্না আজও থামেনি। কাছের মানুষটাকে চিনে নিতে না পারার বেদনা এখনও তাড়িয়ে ফেরে স্বজনহারাদের। আহতদের জীবনে বয়ে নেওয়ার ব্যকুল প্রত্যাশা বিবেককে জর্জরিত করে। গেল বছরের ওই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল ১১৩৫ জন। আর আহত হয়েছিল আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ।

হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিজিএমইএ, বিদেশি  ক্রেতা সংগঠন ও সরকার সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। তবে শ্রমিকদের দাবি এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এতোটাই সামান্য যে বিজয়ের মতো অনেকে আজ ঠিকমতো দু’মুঠো খাবার পাচ্ছে না। চিকিৎসার অভাবে অনেকে কোনো কর্ম করতে পারছে না। রাত পোহালেই পুরো জাতি স্মরণ করবে এই ট্রাজেডির কথা। গা শিউরে ওঠবে অনেকের। আবার ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিয়ে ওঠবে নানা কথা । চলবে বক্তব্য, সভা, সেমিনার কিংবা টকশো।

তবে এতো সব আয়োজনে বিজয়দের কিছু যায় আসে না। টেলিভিশনের রঙ্গিন পর্দায় মাঝ রাতের টকশো, বিদেশি লোকদের বড়বড় হোটেলের সম্মলেনে বলা বড় বড় কথায়ও ওদের কিছু যায় আসে না।  রাতে খালা যখন বলে খাবার নেই তখন তাতে অনেক কিছু যায় আসে। মা-বাবার জন্য বুকের মধ্যে হাহকার ওঠে। স্বজন হারানোর বেদনা পাথর হয়ে বুকে চেপে বসে।

এসইউএম/সাকি