খুলনায় জমির দাম বেড়েছে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত

Khulnaতিন-চার বছরের ব্যবধানে বিভাগীয় শহর খুলনায় জমির দাম বেড়েছে প্রায় ১০০ থেকে ২৫০ শতাংশ। সরেজমিনে দেখা গেছে জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ অল্প সময়ের মধ্যে পদ্মা সেতু হওয়ার কথা থাকায় জমির দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। বেশির ভাগ জমির কেনা-বেচায় মানা হচ্ছে না সরকারি নীতিমালায় বেধে দেওয়া মূল্য।

এদিকে অস্বাভাবিক ভাবে জমির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষেরা মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরির সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না।

বিশেষ অনুসন্ধানীতে জানা যায়, কয়েক বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন মৌজায় প্রতি শতক দ্বিগুণ আর খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) প্রকল্পগুলোর কাঠা প্রতি জমি মূল্য বেড়েছে অন্তত তিন গুণ ।

২০০৮ সালে কেডিএ নিউ মার্কেট পাশের প্রকল্পের প্রতিকাঠা জমির মূল্য ছিল ৬ লাখ টাকা। অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো মূল্য তালিকা অনুয়ায়ী বর্তমান তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ টাকায়। সে হিসেবে ওই এলাকার জমির দাম বেড়েছে ২৫০ শতাংশ। এছাড়া বেশির ভাগ এলাকায় ১০০ শতাংশ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে জমির দাম।।

অবশ্য কেডিএ ও সদর সাব রেজিস্ট্রার কার্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, জমির তুলনায় জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া, নগর সম্প্রসারণ ও সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যাওয়ায় জমির এ মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে সোনাডাঙ্গা থানা মৌজায় সরকারিভাবে বাণিজ্যিক জমি প্রতি শতক জমির মূল্য ছিলো ১ লাখ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬০৮ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৭০ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭২১ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ছিল ৩৩ হাজার ৭৭৩ টাকা।

২০১৪ সাল অর্থাৎ বর্তমান সময়ে ওই মৌজার জমির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক প্রতি শতক ১ লাখ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৭৪৫ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ২ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৩ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ২ লাখ ২০ হাজার ২২৫ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ৩৪ হাজার টাকা।

২০১১ সালে বানিয়াখামার মৌজার সরকারিভাবে বাণিজ্যিক প্রতি শতক জমির মূল্য ছিল ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৪০৮ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতকের মূল্য ছিল ২ লাখ ৯৪ হাজার ৫৮৮ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৩৮৮ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৭২ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ১০২ টাকা।

২০১৪ সালে অর্থাৎ বর্তমান সময়ে ওই মৌজার জমির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক প্রতি শতক জমির মূল্য ১৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৯ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ৪ লাখ ৯৬ হাজার ১০৭ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ৩ লাখ ২৫ হাজার ৭৭৫ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩০৯ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৫ টাকা।

২০১১ সালে নগরীর টুটপাড়া মৌজার সরকারিভাবে বাণিজ্যিক প্রতি শতক জমির মূল্য ছিল ৩ লাখ ৬৫ হাজার ২৩ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার ৭৬৯ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬১৯ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৫১ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ১৮৭ টাকা।

বর্তমানে ওই মৌজার জমির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক প্রতি শতক জমির মূল্য ৭ লাখ ১১ হাজার ১০৪ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ৫ লাখ ১৫ হাজার ৭৯৬ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ৩ লাখ ৯৪ হাজার ২২১ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ২ লাখ ৮ হাজার ২৯৪ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ২ লাখ ২ হাজার ৮৮৯ টাকা।

২০১১ সালে হেলাতলা মৌজার সরকারিভাবে বাণিজ্যিক প্রতি শতক জমির মূল্য ছিল  ৯ লাখ ১২ হাজার টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ছিল ৫ লাখ ৩৪ হাজার ২৩২ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭০ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৭২ টাকা।

বর্তমান সময়ে এ মৌজার জমির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক প্রতি শতক জমির মূল্য ১১ লাখ ৯০ হাজার ৮৪৫ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৫২২ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭০ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৭২ টাকা।

২০১১ সালে বানরগাতী মৌজার সরকারিভাবে বাণিজ্যিক প্রতি শতক জমির মূল্য ছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ৩৩২ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ছিল ২ লাখ ৬ হাজার ৫৪২ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৩২ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ১২০ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ছিল ৫৯ হাজার ৪৮ টাকা।

বর্তমান সময়ে ওই মৌজার জমির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক প্রতি শতক ২ লাখ ১৩ হাজার ৩৩২ টাকা, বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৯৭ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৩ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ১ লাখ ৯৬ হাজার ২৪৮ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ৫৯ হাজার ৪৮ টাকা।

২০১১ সালে মুজগুন্নি বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৭১ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৬৪ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ছিল ৪০ হাজার ৩৩০ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ছিল ৩২ হাজার ৯৩৫ টাকা।

বর্তমান সময়ে ওই মৌজার জমির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাস্তু জমির প্রতি শতক মূল্য ৩ লাখ ২৭ হাজার ২৩৮ টাকা, ডাঙ্গা জমির প্রতি শতক ১ লাখ ৩০ হাজার ১৯৩ টাকা, বিলান জমির প্রতি শতক ৪০ হাজার ৩৩০ টাকা, ডোবা জমির প্রতি শতক ৩৫ হাজার ১৩৫ টাকা ।

২০১১ সালে হাউজিং এস্টেট বাস্তু জমি ছিল প্রতি বর্গগজ ৩ হাজার ৮০৪ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৪০ টাকা। ছাড়া জমির উপর কোন প্রকার ঘড়-বাড়ি থাকলে তার মূল্য আলাদাভাবে প্রতি বর্গফুট ১ হাজার ২০০ টাকা হিসেবে নির্ধারিত হবে।

এদিকে ২০০৮ সালে কেডিএ নিউ মার্কেট পাশের প্রকল্পের প্রতিকাঠা জমির মূল্য ছিল ৬ লাখ টাকা। অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো মূল্য তালিকা অনুয়ায়ী বর্তমান তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ।

২০০৮ সালে মুজগুন্নি প্রধান সড়ক পাশের এলাকায় কেডিএ’র প্রতি কাঠা জমির মূল্য ছিল ৩ লাখ টাকা। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো মূল্য অনুয়ায়ী বর্তমান তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ। ২০০৮ সালে নিরালা আবাসিক এলাকায় কেডিএ প্রকল্পের কাঠা প্রতি মূল্য ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে তার মূল্য বেড়েছে ৬ লাখ।

২০০৮ সালে সোনাডাঙ্গা স্বল্প আয়ের আবাসিক এলাকা ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তা বেড়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

এদিকে নগরীতে জমির কেনা বেচার জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্য থাকলেও তা কেউ মানছেন না। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে জমি কেনাবেচা হচ্ছে। এভাবে খুলনা মহানগরীর জমির মূল্য দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষেরা।

তাদের অভিযোগ জমির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জমি কেনার স্বপ্ন তাদের স্বপ্নই থেকেই যাচ্ছে।

নগরীর রয়্যাল হোটলে মোড় এলাকার বাসিন্দা খান মাহবুবের অনেক দিনের স্বপ্ন নগরীতে ছোট একটা বাড়ি তৈরির জন্য এক চিলতে জমি কিনবেন।আয় স্বপ্ল হওয়ায় স্বপ্নের এক টুকরো জমি কিনতে পারছেন না তিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ফ্লট ও ফ্লাট ব্যবসায়ীর বেপারোয়া অনৈতিক ব্যবসার কারণে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষেরা খুলনায় জমি কিনতে পারছেন না।

সদর সাব রেজিস্ট্রার মো. সিরাজুল করিম জানান, নগরীর উন্নয়ন ও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার সৃষ্টি, জমির তুলনায় জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জমির মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি জানান, জমির গড় হিসাব অনুয়ায়ী সরকারি মূল নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু জমির গুরুত্ব অনুসারে এবং বৈজ্ঞানিকভাবে বিভিন্ন স্থানের জমির ভিন্ন ভিন্ন ও বেশি দামে বিক্রি হতে পারে।

কেডিএর সিনিয়র বৈষয়িক কর্মকর্তা জিএম মাসুদুর রহমান জানান, সরকার জমির মূল্য বৃদ্ধি করায় তারাও মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।