‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য দরকার শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন’

  • Emad Buppy
  • May 17, 2014
  • Comments Off on ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য দরকার শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন’
সিপিডি
সিপিডি
ব্র্যাক সেন্টার-ইনে ‘রাজনৈতিক দলসমূহ এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র’ শীর্ষক সেমিনারে বিশিষ্টজনরা

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা এবং একটি স্বাধীন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠিত হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্টজনরা।

শনিবার ব্র্যাক সেন্টার-ইনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) উদ্যোগে ‘রাজনৈতিক দলসমূহ এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন দেশের বিশিষ্টজনরা।

সিপিডির সভাপতি অধ্যাপক রেহমান সোবহানের পরিচালনায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরী, সুজনের নির্বাহী পরিচালক বদিউল আলম মজুমদারসহ বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ড. রওনক জাহান।

আলোচনায় বক্তারা দেশের বর্তমান অস্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকাকে দায়ী করেন। তারা মনে করেন রাজনীতি করতে হলে রাজনীতিবিদদের নিজেদের মধ্যে অন্যকে সহ্য করার ও সহানুভূতির মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

মূল বিষয়ের ওপর প্রবন্ধে ড. রওনক জাহান বলেন, উত্তরাধিকারের ধারা শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেই নয়, জামায়াত ও জাতীয় পার্টিতেও রয়েছে। যে কারণে পরিবারের বাইরে থাকা নেতৃত্বের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সংসদে শেখ হাসিনার ৭ জন আত্মীয় সদস্য রয়েছেন। একই ধারায় খালেদা জিয়া ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আত্মীয়রাও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, দলের তহবিল সংগ্রহের কারণেই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক নারায়ণগঞ্জের ঘটনাই তার প্রমাণ। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেড়ে যায়। কারণ আদর্শিক কারণে এটি হয় না। অর্থের কারণেই হয়ে থাকে।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, আওয়ামী লীগের ভেতরেও বেশিরভাগ লোক তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি রাখার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু যখন দেখলেন, প্রধানমন্ত্রী এটি না রাখার পক্ষে, তখন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বিলোপের পক্ষে অবস্থান নিলেন তরাও। এ থেকে বোঝা যায়, দলের প্রধানের বিরুদ্ধে কেউ যেতে পারেন না।

রওনক জাহান বলেন, প্রশাসন ও সরকারি দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকছে না। এজন্য রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। অর্থনৈতিক নীতিতে সবগুলো দলের মধ্যে একটি ঐক্য রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়েই দ্বন্দ্ব। সব দলের কাঠামো একই ধরনের।

তিনি বলেন, পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে বিভিন্ন দলে একই পরিবারের রাজনীতিকও পাওয়া যায়। রাশেদ খান মেনন ও সেলিমা রহমান ভাই-বোন হওয়া সত্ত্বেও দু’জন দুই দলে। কৌশলগত কারণে পরিবার রক্ষার স্বার্থেই এগুলো করা হয়।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দলের বাইরে গিয়ে অনেকেই সুবিধা করতে পারছেন না। কারণ, দলের প্রতীক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দলের ভেতরে থেকেই অনেকে গ্রুপিং করছেন। তাই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ছে। দলগুলোকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দল গঠন থেকে বের হয়ে আসা, সংসদ বর্জন পরিহার, সরকার ও দলের মধ্যে পার্থক্য রাখা, দলের ভেতর থেকে সমালোচনার জায়গা তৈরি করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ সেমিনারে বলেন, ট্র্যাজেডি বারবার ব্যবহার করা যায় না। বেনজীর ভুট্টোর স্বামী তার নিহত হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে একবার রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। কিন্তু বারবার এটি ব্যবহার করা যায় না। যেমন, ভারতে কংগ্রেসের সাম্প্রতিক কোনো ট্র্যাজেডি নেই। যে কারণে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে।

তিনি বলেন, যারা বড় বড় নেতা হয়েছেন, তারা কেউই রাজনৈতিক পরিবারের কেউ না। এতো বড় বড় নেতা যখন পরিবারের বাইরে থেকে হয়েছেন, তাহলে এখন কেন সম্ভব নয়?

সুশাসনের জন্য পারিবারিক রাজনীতি ক্ষতিকারক বলে মন্তব্য করে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, সব দল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা উচিত। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে নেক্সাস বন্ধ না হলে গণতন্ত্র সুসংহত হবে না। কারণ, এই তিন শক্তির মধ্যে সেনাবাহিনী যার পক্ষে থাকে, তারাই ক্ষমতায় এসেছে। গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে হলে এটি বন্ধ হতে হবে।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. শামসুল হুদা বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজ দায়িত্বে কিছু করে না এবং করবেও না। বাইরে থেকে চাপ তৈরি করে তা করাতে হবে।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য নিয়মিতভাবে নির্বাচন হতে হবে এবং তা অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে কিছুই হবে না। নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছে। এগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে না পারলে দেশে পিছিয়ে যাবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমশের মবিন চৌধুরী বলেন, উত্তরাধিকারের রাজনীতি অবৈধ নয়। নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃতপক্ষে কিভাবে শক্তিশালী করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে।

সাবেক এমপি আকরাম হোসেন নারায়ণগঞ্জের সন্ত্রাসী নূর হোসেনের আওয়ামী লীগে যোগদান প্রসঙ্গে বলেন, ওই সময় একজন এমপি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, ‘আপা একটা বড় রুই নিয়ে এসেছি। ও বিএনপিতে খুবই সক্রিয় ছিল’। এটি বলার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বাহবাও পেয়েছিলেন ওই এমপি।

বিএনপি চেয়ারপাসরনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দিন শেষে জনগণের মধ্য থেকেই ঐকমত্য আসতে হবে। এজন্য অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। দুর্নীতির তালিকায় যারা শীর্ষস্থানে রয়েছেন, তাদের অধিকাংশই রাজনীতিক।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পদ্ধতিগত কাজ করতে হবে। না হলে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হবে না।