হিমালয় কন্যার যেসব সৌন্দর্য প্রেমময়

পাহাড়ের উপরে পাঁচটি লেক নিয়ে গঠিত পাঁচ পুখারী। এটি নেপালিদের কাছে পবিত্র স্থান।
পাহাড়ের উপরে পাঁচটি লেক নিয়ে গঠিত পাঁচ পুখারী। এটি নেপালিদের কাছে পবিত্র স্থান।

ঘুরতে যাওয়া বা ভ্রমণ করা সব সময় আনন্দের। সেটা হোক দেশে বা দেশের বাইরে। আর আপনার ভ্রমণ যদি হয় হিমালয়ের দেশে। তবে সেটা কতটা রোমাঞ্চকর! ভাবতেই মজা লাগবে, আপনি হিমালয় কন্যার সাথে সাক্ষাত করতে ছুটে চলেছেন। আর আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে বলে অপেক্ষা করছে হিমালয় কন্যা।
হিমালয়ের দেশ নেপাল। বিশ্বের যে কোনো দেশের পর্যটকের জন্য এটা খুবই আকর্ষণীয় স্থান। পাহাড়-পর্বতে ঘেরা নেপালে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো আছে অনেক স্থান। এভারেস্ট ছাড়াও এখানে আছে বেশ কিছু পুরনো মন্দির, জলপ্রপাত ইত্যাদি।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ায় কিছু বেশি সুবিধা পাওয়ার অধিকার তো আমাদের আছেই। কাছাকাছি হওয়াতে নেপালের পরিবেশের সাথে মিশে যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য খুব কঠিন কিছু না।
ভ্রমণ শুরু করার আগেই নেপালের দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে কিছু জানা থাকলে খুব সহজে ঘুরে দেখতে পারবেন যা কিছু দর্শনীয়। আর নেপাল যাওয়ার পর না জানার কারণে যদি কিছু দেখা না হয়, তবে দেশে ফিরে আক্ষেপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তাই আগেই তৈরি করুন আপনার ভ্রমণ স্পটের তালিকা।

মিলিয়ে নিতে পারেন এই তালিকার সাথে।

মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্প মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্প মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্প
মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্প

মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্প: পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার ইচ্ছে বা আগ্রহ না থাকলেও একবার ঘুরে আসতে পারেন মাউন্ট এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকে। এভারেস্ট জয়ের কিছুটা স্বাদ হয়ত পেয়ে যাবেন এখানে এসেই।

বেস ক্যাম্পটি সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উঁচুতে। তাই এখানে যাওয়ার জন্যই প্রয়োজন চমৎকার শারীরিক যোগ্যতা।

ভক্তপুর: ভক্তপুর শহরের অবস্থান কাঠমান্ডু থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে। শহরটি মধ্যযুগীয় শিল্প-সাহিত্য, কাঠের কারুকাজ, ধাতুর তৈরি মূর্তি ও আসবাবপত্রের যাদুঘর বলে পরিচিত। শহরটিতে বৌদ্ধ মন্দির ও হিন্দু মন্দিরের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। ৫৫টি জানালা সমৃদ্ধ রাজপ্রাসাদ ও তার অপূর্ব কারুকাজ নেপালের ঐতিহ্য বহন করে।

ভক্তপুর
ভক্তপুর

প্রাচীন রাজাদের আবাসস্থল ছিল ভক্তপুর। বেশ কিছু ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে এখানে। প্রাচীন কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার ছোঁয়াও এখানে পাওয়া যায়। এখানকার স্থানীয়রা এখনও কাঠমান্ডু ভ্যালির অনেক আবাদি জমিতে ফসল ফলায়। এর চিহ্ন মিলে, স্থানীয়দের বাড়ির জানালায় ঝুলে থাকা খড়, কিছু পাত্র আর কৃষি কাজে ব্যবহৃত নানা উপকরণের প্রাচুর্য।
ভক্তপুরের দর্শনীয় স্থাপত্যের মধ্যে রয়েছে-পশ্চিম তামূধি তোল গেট, পটার্স স্কয়ার, পটার্স স্কয়ারের সিংহদ্বার, তামূধি তোল, নয়া তাপোলা মন্দির, ভৈরবনাথ মন্দির, তিল মহাদেব নারায়ণ মন্দির, দরবার স্কয়ার, এরোটিক এলিফ্যান্টস মন্দির, উগরাচান্দি এবং ভৈরব মূর্তি, রাজা ভূপতিন্দ্র মাল্লার কলাম, ভত্সলা দুর্গা মন্দির এবং তেলেজু ঘণ্টা, রাজভবন, ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি, সোনালী গেট, চায়াসিলিন মণ্ডপ, সিদ্ধি লক্ষ্মী মন্দির, ফাসিদেগা মন্দির, তাধূনচেন বাহাল, তাচুপাল তোল, দত্তনারায়ণ মন্দির, ভীমসেন মন্দির, তাচুপাল জাদুঘর ইত্যাদি।

nagarkot1
নাগরকোট

নাগরকোট: কাঠমুন্ডু থেকে ৩২ কি.মি. পূর্বে নাগরকোটের অবস্থান। ভক্তপুরের সবচেয়ে নৈসর্গিক স্থান এটি। যেখান থেকে হিমালয়ের জমকালো সূর্যোদয় দেখা যায়। পর্যটকরা কাঠমুন্ডু থেকে গিয়ে নাগরকোটে রাত্রি যাপন করে সূর্যোদয় দেখার জন্য। বিশেষত বসন্তকালে দর্শনার্থীরা নাগরকোট ভ্রমণে যায়। এ সময় বিভিন্ন রকমের ফুলের সমারোহ ঘটে।
এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টা নাগরকোট ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো। এ সময়ের তাপমাত্রা ১০-১৫ ডিগ্রির নিচে কখনও নামে না। আবার ২৩ ডিগ্রির বেশি ওঠে না। তবে ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি সময়টা খুব খারাপ। ৩ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যায় তাপমাত্রা। ১৪ ডিগ্রির উপরে কখনও তাপ ওঠে না। কুয়াশার চাদর মেখে হিমালয় কন্যা তখন দীর্ঘ শীতনিদ্রায় কাতর থাকেন।
নাগরকোট গ্রামের বৈশিষ্ট্য হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থানে এটি অবস্থিত। পৃথিবীর অন্যান্য গ্রামে বসবাসকারী মানুষজন যেখানে মাঠ থেকে আকাশকে দেখে। সেখানে নাগরকোটের বাসিন্দারা নিচে তাকিয়ে আকাশ দেখে। ঠিক যেন স্বর্গের অপার সৌন্দর্য অনুভব করার মতো অবস্থা। এভারেস্ট ছাড়াও বেশ কয়েকটি চূড়া এখান থেকে দেখা যায়। এর মধ্যে লাংটাং, মানাসলু, গৌরীশংকর অন্যতম।
কাঠমুন্ডু থেকে নাগরকোট গাড়িতে যেতে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। কাঠমুন্ডু থেকে রওনা দিয়ে রিং রোড ছাড়িয়ে তালকোট পার হয়ে শুরু হয় পাহাড়ের গা ঘেঁষে সরু পেঁচানো রাস্তা। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে উপত্যকা। রাস্তা আকাশের দিকে মুখ করে ২০০০ মিটার ওপরে উঠে গেছে। সৌন্দর্যের চরম লীলাখেলা।
যেতে যেতে দেখা যাবে, পাহাড় থেকে খুব সরু ঝিরঝিরে ঝর্ণা নেমে এসেছে বিভিন্ন জায়গায়। ঘরের উঠোনে মুরগি আর শূকরছানার ঘোরাঘুরি। শুকোতে দেওয়া ভুট্টা আর আলু বোখারা (পিচ)। লাল আপেলের মতোন গাল আর সরু চেরা চোখের শিশুরা। ঘরের দ্বারে জপ মালা হাতে মন্ত্র পাঠরত ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি পোশাকের বৃদ্ধা।
এছাড়া পশমিনা, কাঠের কাজ, পাথরের চুড়ি, মালা, কানের দুল, ইয়াকের হাড়ের জিনিসপত্র, নানা সাইজের, নানা ভঙ্গিমার বরাভয় মুদ্রায় গৌতম বুদ্ধের মূর্তি, নেপালি কুকরী সবই আছে এখানে।
উন্নতমানের কিছু হোটেল আছে নাগরকোটে। ক্লাব হিমালয়ানের কথা না বললেই নয়। ওদের প্রায় সবগুলো রুম থেকেই হিমালয় দেখা যায়। নিজস্ব অবজারভেটরিও আছে। ব্যয় একটু বেশি। মাঝারি মানের হোটেল আর ব্যক্তিগত গেস্ট হাউসও আছে এখানে। তবে পানির সমস্যা প্রকট। বড় হোটেলগুলোতে নিজস্ব পানি পরিবহন এবং উত্তোলনের ব্যবস্থা আছে।

pokhara
পোখারা

পোখারা: নেপালের ছোট্ট পর্যটন শহর পোখারা। নেপালি ভাষায় পোখারা মানে পুকুর বা দিঘী। এখানে এনেখ লেকও রয়েছে। আদিম বাতাস, জমকালো তুষারাবৃত সরু চূড়া, নির্মল লেক এবং শ্যামলিমাবেষ্টিত এটি যেন হিমালয়ের রত্ন। এর তিনটি প্রধান লেক পেহুয়া, রূপা এবং বেগনাস। এটি ভারত এবং তিব্বতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা।
কাঠমান্ডু থেকে পোখারার সাত ঘণ্টার পথ। শুধু পথ নয়,নিসর্গের সঙ্গে আলাপ করতে করতে এগিয়ে চলা। আঁকা-বাঁকা,উঁচু-নিচু,খাড়া-ঢালু এক আশ্চর্য পথ। একদিকে উঁচু পাহাড় অন্যদিকে গিরিখাদ।
পোখারার বাসস্ট্যান্ডটি ছোট। এখানে রয়েছে ছোট-বড়,মাঝারি মানের বেশ কয়েকটি হোটেল।পোখারায় পৌঁছলেই পালিয়ে যাবে সকল ক্লান্তি।
ফেউয়া লেকে নৌকায় করে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ তুলনাহীন। লেকের অন্য পাড়টি পাহাড়-ঘেরা। পাহাড় বেয়ে নামছে জল। আর বিভিন্ন স্থানে স্থানে পিকনিক স্পট।
একটি মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সেতি নদী। এটাকে নদী না গিরিখাদ! তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে দুধসাদা জল। সেই সেতুর রেলিং থেকে নিচের দিকে তাকালে আতঙ্ক।
ডেভিস ফলস: একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণা। আগে এর নাম ছিল, প্যাটালি সাঙ্গো। ১৯৬১ সালের ৩১ জুলাই বিকেলের রোদে সুইস তরুণী ডেভিস তার স্বামীর সাথে গোসল করতে নামলে লেক থেকে হঠাৎ দ্রুত বেগে নেমে আসা পানির স্রোতে ভেসে যায় ডেভিস। অনেক দিন পর তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে জীবত নয়; তখন সে মৃত।পরবর্তীতে তার স্মৃতিতে এই ঝর্ণার নামকরণ হয় ডেভিস ফলস।

ডেভিস ফলস
ডেভিস ফলস

৫০০ মিটার দীর্ঘ এবং ১০০ মিটার গভীর নয়নাভিরাম ঝর্ণা প্রবাহ এটি। বছরের প্রায় সব সময় ডেভিস ফলস-এর প্রবেশ পথের সামনে অনেকগুলো ছোট ছোট দোকান থাকে। বেশিরভাগ দোকনেই নারী বিক্রেতা। এর মধ্যে খুব কম সংখ্যক নেপালি। ভারত এবং তিব্বতের নারীর উপস্থিতি বেশি। কয়েকটি দোকান নারী-পুরুয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত। নেপালি পণ্যে সাজানো দোকানগুলো। নারীর ব্যবহারযোগ্য বর্ণিল পাথুরে অলংকার, স্থানীয় পোষাক-পরিচ্ছদ, শীতবস্ত্র, রাধাকৃষ্ণ, গৌতমবুদ্ধের মূর্তি ইত্যাদি পাওয়া যায়।
এছাড়াও আছে- ভীমসেন মন্দির, মাঙ্গা হিতি, বিশ্বনাথ মন্দির, কৃষ্ণ মন্দির, জগন্নারায়ণ মন্দির, রাজা যোগেনারেন্দ্র মাল্লার মূর্তি, হরি শঙ্কর মন্দির, তেলেজু ঘণ্টা, কৃষ্ণা মন্দির, রাজপ্রাসাদ (রয়েল প্যালেস), পাটান জাদুঘর, মাল চৌক, সুন্দরী চৌক, সোনালী মন্দির (কুয়া বহাল), কুম্বেশ্বর মন্দির, উমা মহেশ্বর মন্দির, বিশ্বকর্মা মন্দির, বাহাবাহি, মীননাথ মন্দির, রাতো মাচেন্দ্রনাথ মন্দির, মহাবুদ্ধ মন্দির, উকু বহাল (রুদ্র বর্ণ মহাবিহার), লগন স্তম্ভ, চিড়িয়াখানা, পশ্চিমা মন্দির ইত্যাদি।

অন্নপূর্ণা: অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প ট্র্যাক অবশ্যই অন্নপূর্ণা অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান। অন্নপূর্ণা ট্র্যাকিং সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্র্যাকিং। যারা ট্র্যাক করে তাদের জীবনে একবার হলেও এখানে যাওয়ার ইচ্ছে জাগবে। নেপালের অন্নপূর্ণা অঞ্চলের কেন্দ্রীয় উত্তর অংশে অবস্থিত স্থানের নামকরণ করা হয়েছে ‘হিমালয়ের গর্জন’।

অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প ট্র্যাক
অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প ট্র্যাক

বছরের যে কোন সময় এখানে ট্র্যাক করা যায়। তবে অতিরিক্ত বরফের কারণে মাঝে মাঝে শীতকালে ট্র্যাক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে বসন্তকাল হচ্ছে ট্র্যাকিং-এর উপযুক্ত সময়। এসময় রাজকীয় ভাব পাওয়া যায়।
অন্নপূর্ণার মূল পীক হচ্ছে গভীর হিমবাহ পরিহিত স্থান যা অ্যাম্পিথিয়েটার নিয়ে প্রায় ১০ মাইল ব্যাস একটি বৃত্তে প্রায় অবিকল সাজানো। এটি অন্নপূর্ণা হিমাল, হিয়ান চুলি, অন্নপূর্ণা দক্ষিণ, অন্নপূর্ণা ফ্যাঙ্গ, অন্নপূর্ণা-১, গঙ্গাপূর্ণা, অন্নপূর্ণা-৩, গন্ধরবা চুলি এবং মাছাপুছেরে নিয়ে গড়া।
কাঠমুন্ডু: এটি নেপালের রাজধানী এবং বৃহৎ শহর। এখানে রয়েছে আশানটোল, সেতো মাখিন্দনাথ মন্দির, শিভা মন্দিরসহ আকর্ষনীয় বিভিন্ন স্থান।
কাঠমুন্ডু ভ্যালি: নেপালের তিনটি প্রাচীন নগরী নিয়ে গঠিত কাঠমুন্ডু ভ্যালি। এর মধ্যে রয়েছে কাঠমুন্ডু, পাটান এবং ভক্তপুর। কাঠমুন্ডু ভ্যালিতে কয়েক শত অপরূপ সুন্দর স্মৃতিসৌধ, ভাস্কর্য, শৈল্পিক মন্দির এবং কুমারী মেরির স্মারক রয়েছে।

গোল্ডেন গেট
গোল্ডেন গেট
chitwan-national-park
চিত্বান জাতীয় পার্ক

গোল্ডেন গেট: এটি নেপালের গর্ব। এটি মূল্যবান পাথর দিয়ে তৈরি ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় নিদর্শন। এই রাজকীয় দরজাটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।
রারা লেক: রারা জাতীয় উদ্যান বেষ্টিত এটি অপরূপ সুন্দর একটি লেক। নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত এই লেকটি সমুদ্রপিষ্ট থেকে ২ হাজার ৯৯০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত।
তিলেচো লেক: এটি পৃথিবীর বৃহৎ লেকগুলো মধ্যে অন্যতম। এ লেকটি প্রায় ৫ হাজার মিটার বিস্তৃত। তবে এ এলাকায় পর্যটকদের জন্য থাকার কোন ব্যবস্থা নেই।
পুন হিল: অন্নাপূর্ণা পর্বত দেখার জন্য উন্মুক্ত স্থান হচ্ছে পুন হিল। পর্বত দেখার জন্য এই স্থানটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। ভুলেও এটি না দেখে নেপাল ত্যাগ করবেন না।
হিস্ট্রি মিউজিয়াম: কাঠমুন্ডু শহর থেকে ভক্তপুর যাওয়ার পথেই রয়েছে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম। এখানে রয়েছে নেপালের ১৪ হাজারেরও বেশি প্রাণি, পতঙ্গ ও পক্ষীকুল। প্রজাপতি, সরীসৃপ, মাছ, পাখি ও স্তন্যপায়ী নানা জীবজন্তু।
চিত্বান জাতীয় পার্ক: চিত্বান শব্দের সাহিত্যিক প্রতিশব্দ জঙ্গলের হৃদয়। ৫৬ প্রজাতির স্থন্যপায়ী, ৪৯ প্রজাতির উভচর প্রাণি এবং ৫২৫ প্রজাতির পাখি ছাড়াও এখানে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় এক শিং-এর গণ্ডার, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বুনো হাতি, চার শিং-এর কৃষ্ণসার মৃগ, চিতাবাঘ, বন্য শুকর, বানর ইত্যাদি।

লুম্বিনি: লুম্বিনি নেপালের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি। এখানে রয়েছে পুষ্করিণী, মায়াদেবীর প্রাচীন মূর্তি, বৌদ্ধ মন্দির, থাই মনেস্ট্রিসহ সবুজ ঘাসে-ছাওয়া প্রান্তর। এখানে প্রতিদিনই বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বর্তমানে লুম্বিনিতে বিভিন্ন দেশের শিল্পকলা ও সংস্কৃতির চিত্র তুলে ধরা হয়। এখানে ধর্মীয় অনুসারীদের থাকার জন্য মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে।
জানাকপুর: এটি সীতার জন্মস্থান। একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এখানে রয়েছে জানাকী মন্দির এবং ১১৫টি ঐতিহাসিক পুকুর। যার মধ্যে গঙ্গা সাগর, পরশুরাম কুন্দা এবং ডানুসা সাগরের উল্লেখ না করলেই নয়।
স্বয়ম্ভুনাথ স্তুপা: কাঠমান্ডু শহরের পশ্চিমে উঁচু পাহাড়ে স্বয়ম্ভুনাথের অবস্থান। এখানে প্রচুর বানর থাকে, তাই একে বানর মন্দির বলে। বৌদ্ধ ইতিহাস এবং কাঠমান্ডুর সবচেয়ে পুরোনো ও প্রসিদ্ধ স্থান এটি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান। স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ঈচুঙ্গু নারায়ণ মন্দির অবস্থিত।
পাঠান: কয়েক ডজন মন্দির ও ভাস্কর্যের উপস্থিতিতে পাঠান হচ্ছে শিল্প প্রমিকদের জন্য খুবই আকর্ষণীয়। এখানে তিব্বতের শরনার্থীদের তৈরি করা ঐতিহ্যবাহী কার্পেট পাওয়া যায়। যা পর্যটকদের আকর্ষণেন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
পাঁচ পুখারী: পাঁচটি লেক নিয়ে গঠিত পাচ পুখারী। এটি নেপালিদের কাছে পবিত্র স্থান।

গোসাই খোদা লেক
গোসাই খোদা লেক

গোসাই খোদা লেক: হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো গোসাই খোদা লেক।
নেপাল সম্পর্কে এতো কিছু জানার পর এখন নিশ্চয় আপনি প্রস্তুত। তবে এবার জেনে নিন, কিভাবে যাবেন নেপালে? কখন যাবেন? কোথায় থাকবেন? নেপালে আপনার জন্য কি খাবারের ব্যবস্থা আছে? এসব জানা থাকলে অনেক সুবিধা পাবেন আপনি।
ভ্রমণের সময়: নেপালে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে উত্তম সময় হলো অক্টোবর-নভেম্বর অথবা মার্চ-এপ্রিলে। এ সময় অল্প গরম থাকে এবং আকাশ পরিষ্কার থাকে। এতে যে কোনো স্থান এবং পর্বতমালা অনায়াসে পরিষ্কার দেখা যাবে।
ভিসা প্রসেসিং: নেপালের টুরিস্ট ভিসা ঢাকার নেপালি দূতাবাস থেকেই পাওয়া যায়। যথাযথভাবে আবেদন করলে এক দিনের মধ্যেই ভিসা মিলে। কাঠমুন্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ফরম পূরণের মাধ্যমে ভিসা পাওয়া যায়। বাংলাদেশিরা নেপাল ভ্রমণের জন্য আগেই ভিসা সংগ্রহ না করলে ওই বিমানবন্দর থেকে ভিসা সংগ্রহ করার সুবিধা রয়েছে। এক্ষেত্রে অন এরাইভাল ভিসার মাধ্যমে নেপালে পৌঁছার পর নেপালি বিমানবন্দর থেকে ভিসা নিতে হয়। গেট ফি বাংলাদেশিদের জন্য ১৫০ নেপালি রুপি।
প্রথমবার নেপাল ভ্রমণের জন্য কোনো টাকা ছাড়াই টুরিস্ট ভিসা পাওয়া যায়। দ্বিতীয়বার থেকে ফি দিয়ে ভিসা সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিবার ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং পাসপোর্ট সাইজ ছবি নিতে ভুলবেন না।
ফ্লাইট: ঢাকা থেকে কাঠমুন্ডু যাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ প্রোগ্রাম আছে। এসব প্যাকেজে ১৬ হাজার থেকে ২৬ হাজারের মধ্যে। এক্ষেত্রে ৪ দিন থেকে ৭ দিন পর্যন্ত প্যাকেজ প্রোগ্রাম থাকে। এছাড়া নিজ উদ্যোগেও নেপাল যেতে পারবেন। সড়ক এবং বিমান বাংলাদেশ থেকে উভয় পথে নেপাল যাওয়ার সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানে ঢাকা-কাঠমান্ডু-ঢাকা জনপ্রতি ১৯ হাজার টাকার প্যাকেজ রয়েছে।
আবাসিক হোটেল: নেপালের হোটেলভাড়া এলাকা ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী বিভিন্ন রকম। কাঠমুন্ডুর বিভিন্ন স্থানে দেড় হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে প্রচুর হোটেল পাওয়া যায়।
নেপালের কিছু হোটেলের নাম ও ঠিকানা:
ডাওয়ারিকা, বাট্টিস্পুটালি, কাঠমুন্ডু।
হোটেল র্যাডিসন, লাজিম্পাট, কাঠমুন্ডু।
হোটেল কোর্টিয়ার্ড, ৬৭/২৭, জেড স্ট্রিট, থামাল।
হায়াট রিজেন্সি, তারাগাও, বুদ্ধা।
খাবার দোকান: সাধারণ খাবারের মধ্যে এখানে ভাত, সবজি, মাছ/মাংস, ডাল ইত্যাদি অধিকাংশ খাবারের দোকানে পাওয়া যায়। এছাড়া জাতি ও গোষ্ঠীভেদে এখানকার হোটেলগুলোর নিজস্ব কিছু খাদ্য তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে মম, থুকপা, সাম্পা, ধেদো, ছাতামারি, চৈলা, গুনদ্রুক, কোয়াতি, কাপচে অন্যতম।
স্থায়ী রেস্টুরেন্ট ছাড়াও ভ্রাম্যমাণ কিছু রেস্টুরেন্ট নেপালের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। এখানে নওয়াবি খাবারসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার বিক্রি করে। দামে সস্তা এবং স্থানীয় রান্নার স্বাদ পেতে এখানে খেয়ে দেখতে পারেন।
কেনাকাটা: সাধারণ কেনাকাটার জন্য পাটান ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাস্টেট ও নামাস্তে সুপার মার্কেট উল্লেখযোগ্য। কার্পেটের জন্য জাওয়ালাখেল হ্যান্ডিক্র্যাফট সেন্টার বিখ্যাত।
নেপালে গিয়ে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকে ঐতিহ্যবাহী ধাতুর এবং কাঠের তৈরি নানা সামগ্রী। ব্রোঞ্জের তৈরি বিভিন্ন জিনিসের জন্য পাটানের জুড়ি পুরো মেলা ভার। এগুলোর দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই আর গুণগত মানও ভালো। ৫০ থেকে শুরু করে দুই লাখ রুপি মূল্যের বিভিন্ন জিনিস এখানে মিলবে। এর জন্য বিখ্যাত দোকানের নাম উডকার্ভিং স্টুডিও।
যারা উপহার দিতে পছন্দ করেন তাদের জন্য উল্লিখিত দোকানের পাশাপাশি রয়েছে পাটান দরবার স্কয়ারের চত্বরের অস্থায়ী দোকান। এগুলো স্থানীয়দের দ্বারা পরিচালিত।
অন্যান্য মার্কেট এবং দোকানের পাশাপাশি আপনার পছন্দের জিনিস ক্রয়ের জন্য যেতে পারে কুম্বেশ্বর টেকনিক্যাল স্কুলে। এটি একটি ব্যক্তিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান। এই স্কুলটি হস্তশিল্প প্রশিক্ষণের পাশাপাশি স্বল্প মূল্যে বিভিন্ন হস্তনির্মিত সামগ্রী বিক্রি করে। এগুলো সাধারণত স্থানীয় দরিদ্র অধিবাসীদের নির্মিত।
নেপালে কেনাকাটা করতে গেলে দাম শুনে হতাশ হবেন না। পর্যটকদের কাছ থেকে বহু লাভের আশায় উচ্চ মূল্য দাবি করলেও একটু দরদাম করে অনেক সস্তায় কিনতে পারবেন আপনার প্রয়োজনীয় এবং পছন্দের কিছু জিনিস।
নেপালে নিরাপত্তার ব্যাপারে একেবারেই চিন্তা করতে হবে না। নেপালিরা খুবই আন্তরিক ও সাদামনের মানুষ। আপনি চাইলেই বছরের বিনোদন ছুটিটা নেপালে কাটিয়ে আসতে পারেন।
একটি সতর্ক বার্তা:
প্রতিটি ভ্রমণ শুরু করার আগেই কিছু জিনিস নিয়ে আপনি প্রস্তুত থাকুন। তার মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ফটোকপি, ছবি, কলম, স্টাপলার, গ্লু, স্কচ টেপ, কাপড় টানানোর ছোট দড়ি, কিছু ঔষধ ইত্যাদি থাকা অত্যাবশ্যক।
এইচকেবি/এমই