প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি জাহাজভাঙা শিল্পে

  • Emad Buppy
  • May 1, 2014
  • Comments Off on প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি জাহাজভাঙা শিল্পে

ship-breakingপ্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকরা। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস, অগ্নিকাণ্ড এবং যন্ত্রাংশের নিচে চাপা পড়ে এ পর্যন্ত মারা গেছে অন্তত সাড়ে পাচঁশ শ্রমিক।

সরকারি ও সংশ্লিষ্ট মালিকদের দেওয়া তথ্য মতে, ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহত হয়েছে ১৪২ জন। এর আগের ২০ বছরে নিহত হয়েছে ৪০০ জন। তবে জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেশ কয়েকটি এনজিওর দাবি তিন দশকে এ মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

এদিকে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ, ভারত ও সুইজারল্যান্ড থেকে একযোগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ বছরে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় মারা গেছে অন্তত এক হাজার শ্রমিক। এছাড়া গ্রিনপিস এবং ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস নামের দুটি সংস্থার জরিপে বলা হয়েছে, সীতাকুণ্ডেগড়ে প্রতিদিন একজন করে শ্রমিক আহত হয়, মারা যায় গড়ে সপ্তাহে একজন।

১৯৬০ সালে ঝড়ে আটকেপড়া এমভি আল পাইন জাহাজকাটার মধ্য দিয়ে সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের যাত্রা শুরু করে। এখন তাকুমিরা পর্যন্ত  সমুদ্রতটের ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় দেড়শতাধিক কোম্পানি জাহাজ কাটার কাজ করছে। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২০ হাজার শ্রমিকের আবাসন, খাওয়া-দাওয়া, গোসল, চিকিৎসাসেবা, চিত্তবিনোদনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় তেমন কোনো সুবিধাই নেই। হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ভয়ে বেশিরভাগ কোম্পানি শ্রমিকদের স্থায়ী নিয়োগ দেয় না। তাই দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকরা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পায় না। নিহতদের পরিবারকে ২৫-৩০ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়। এসব টাকা পেতেও রয়েছে নানা ভোগান্তি। আহতদের তেমন কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয় না। এমনকি পরবর্তীকালে সুস্থ হয়ে ফিরলেও তাদের কপালে জাহাজ ভাঙার কাজ জোটে না। এ শিল্পে শ্রমিকদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় ন্যায্য দাবি আদায়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করলেও শ্রমিকরা পায় না ন্যায্য পারিশ্রমিক। সেফটি সু, হাতমোজা, হেলমেটের মতো নিরাপত্তা সরঞ্জাম মালিকপক্ষ থেকে দেওয়া হয় না। এ কারণে শ্রমিকরা জরুরি এসব পোশাক ছাড়াই ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা লোহা, ফিটার, কাটার ও প্লেট নামে ৪টি বিভাগে কাজ করে থাকে। পুরোনো জাহাজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে প্রায় শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কখনো জাহাজ কাটার সময় গ্যাস বিস্ফোরণে আগুনে পুড়ে মারা যায় অনেক শ্রমিক। তবু সেখানে নেয় অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র। আর পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় জাহাজ থেকে কাটা যন্ত্রাংশের নিচে চাপা পরে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে অঙ্গহানির ঘটনাতো স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

জাহাজ ভাঙার শ্রমিকরা প্রাচীন যুগের সেই দাসদের মতো শ্রম দিয়ে ঘোরাচ্ছে দেশের অর্থনীতির চাকা। এদেরকে বঞ্চনা ও অবহেলা থেকে বাঁচাতে এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। শুধু কোনো দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু হলে নড়েচরে বসে দেশের সুশীল সমাজ। সেইসঙ্গে শ্রমিক রক্ষায় সরকার দেয় বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি। পরে সবাই সব ভুলে যায়। পরিবেশ রক্ষা ও শ্রমিকদের নিশ্চিত করে উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে দেশের জাহাজভাঙা শিল্প রক্ষার জন্য ২০০৯ সালে ১১টি সুপারিশ করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। আজ পর্যন্ত তার একটি সুপারিশ ও বাস্তবায়ন হয়নি।

আন্তর্জাতিক শ্রম আইন, পরিবেশ আইন ও  দেশীয় আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এসব জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকরা।

পরিবেশবাদী আইনজীবীদের সংঘঠন ‘বেলা’র ২০০৯ সালের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ইয়ার্ডের পরিবেশ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বেশ কিছু নির্দেশ দেন। গ্রিনপিস তালিকাভুক্ত বিপজ্জনক বর্জ্য বহনকারী জাহাজ বাংলাদেশে আমদানির আগে দূষণমুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫, বাসেল কনভেনশন-১৯৮৯, কলকারখানা আইন-১৯৬১ এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর আলোকে বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বিধিমালা ও রেগুলেশনস প্রণয়নের জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়। কিন্তু সেই বিধিমালা এখনো তৈরি করা হয়নি। ফলে মালিকপক্ষ কোনো আইনের তোয়াক্কা না করায় বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা ।

সীতাকুণ্ড শিপব্রেকিং ইয়ার্ড এলাকার পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন একজন গবেষক  আবদুর রহমান রানা অর্থসূচককে বলেন, পরিবেশ আইন ও শ্রম আইন না মেনে অর্থের লোভে কিছুশিপ ইয়ার্ড মালিককরা শ্রমিকদেরকে নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনতিবিলম্বে জাহাজভাঙা শিল্পে দেশের বিদ্যমান শ্রম আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে শ্রমিক হত্যা বন্ধ হবে না ।

যদিও বাংলাদশে সরকার ২০১১ সালেই জাহাজভাঙাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করেছে কিন্তু অধকিাংশ জাহাজভাঙা শিল্পে কোনো ধরনের শ্রমিক আইন মেনে চলা হয় না। মালিকরা দরিদ্র শ্রমিকদের দিয়ে বিষাক্ত জাহাজ ভাঙছেন কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, এমনকি নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই।

তাই বাংলাদেশের শ্রম আইন-২০০৬-এর আলোকে জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি রোধের দ্রুত নিয়ন্ত্রণমূলক বিধি তৈরি করা প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

কেএফ