আবারও রাবির আধিপত্য নিতে তৎপর শিবির

ছাত্রশিবির

ছাত্রশিবিররগ কাটার রাজনীতির মাধ্যমে আবার দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আধিপত্য নিতে তৎপর হয়ে উঠেছে মৌলবাদী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির।

কয়েক মাস পর পর চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটেই চলছে। একের পর এক ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীদের পংগু করে দিয়ে ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে শিবির।

জানা যায়, ১৯৮৮ সালে ৩১ মে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি জামিল আকতার রতনকে চার হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করার মধ্য দিয়ে শিবির রগ কাটার রাজনীতির সূচনা করে। ১৯৯৯ সালের ১৬ নভেম্বর রাতে ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস ছাড়া করার পরবর্তী এক দশক শিবিরের রগ কাটার রাজনীতি প্রায় বন্ধ ছিল।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিবির আবারও রগ কাটার রাজনীতিতে ফিরে আসে। ওইদিন শিবির ছাত্রলীগ কর্মী ফিরোজ মাহমুদ, আরিফুজ্জামান, শহিদুল ইসলাম এবং সাইফুর রহমান বাদশাসহ ৬ জনের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়। এরপর প্রায় আড়াই বছরের অধিক সময় শিবিরের রগ কাটার রাজনীতি বন্ধ ছিল।

২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হত্যাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিনের আধিপত্য হারানোর পর আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যায় শিবির। পরে গত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে নৃশংস চেহারায় আবারও ফিরে আসে শিবির। ক্যাম্পাসে আধিপত্য ফিরে পেতে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের মুঠোফোনে হুমকি ও চোরাগোপ্তা হামলার পথ বেছে নেয় এ সংগঠনটির সদস্যরা। ছাত্রলীগের মনোবল ভেঙে দিতে এবং সাহসী নেতা-কর্মীদের নিষ্ক্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর কৌশল নেয় শিবির। এরই অংশ হিসেবে ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর প্রথম বড় ধরনের মিশনে নামে শিবির।

এদিন রাতের অন্ধকারে বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া হলের সামনে ছাত্রলীগের তৎকালীন সহসভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিমকে কুপিয়ে হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় তারা। ওই সময় তাকিম ছিলেন রাবি ছাত্রলীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। পরিকল্পিতভাবে তার ওপর নৃশংস হামলা চালায় শিবির। হামলার পর দীর্ঘ ২৩ দিন অজ্ঞান অবস্থায় থাকার পর জ্ঞান ফিরে তাকিমের।

২০১৩ সালের ১৮ মার্চ রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বিনোদপুর এলাকায় ৩০ নভেম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার দুই পায়ের রগ কেটে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় শহিদুল ইসলামের বাড়িতে থাকা স্কুল শিক্ষক মাইনুল ইসলামের বাঁম হাতের রগ কেটে দেওয়া হয়। দুর্বৃত্তরা শিবিরের নেতা-কর্মী ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজারের পাশে হাবিবুর রহমান নামের এক ছাত্রলীগ নেতার বাঁম পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির ক্যাডাররা। তিনি রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অস্ত্রোপচার করে তার বাম পা কেটে ফেলতে হয়। এখন হাবিবুর পংগু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

২০১৩ সালের ২২ আগস্ট রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ আল হোসেন তুহিনের ওপর হামলা চালায় শিবির। এর এক মাস আগেই তিনি রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা  হামলা চালিয়ে তার হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তুহিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় তাকে।

২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বিনোদপুর এলাকায় রাবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম সাদ্দামকে কুপিয়ে হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির ক্যাডাররা। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার ফুসফুসও কেটে যায়। ঢাকার পংগু হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন গ্রামের বাড়িতে আছেন সাদ্দাম।

এরপর গত ১৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সামনে মহানগর ছাত্রলীগের নেতা শিমুল আহমেদ ডিউকের ওপর হামলা চালায় শিবির। দিনদুপুরে কুপিয়ে তার হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির ক্যাডাররা।

সর্বশেষ মঙ্গলবার সকালে প্রকাশ্যে দিবালোকে রাবি ছাত্রলীগের ছাত্রবৃত্তিবিষয়ক সম্পাদক টগর মোহাম্মাদ সালেহ এবং ছাত্রলীগ কর্মী মাসুদ হোসেনের ওপর নৃশংস হামলা চালায় শিবির। শিবির ক্যাডারদের নৃশংস হামলায় দুই পা হারিয়েছেন মাসুদ। অপর ছাত্রলীগ নেতা টগরের দুই হাত ও পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছে। তারা এখন ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন।

রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা বলেন, শিবির হত্যা ও খুনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। মৌলবাদী ছাত্রশিবিরকে রুখতে সকল প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

এমআই/সাকি