দেশীয় শিল্প সহায়ক বাজেট চায় বাংলাদেশ চেম্বার

২০১৪-১৫_49840আগামি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট দেশীয় শিল্প সহায়ক হোক এমনটিই চায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। আর তাই আসন্ন বাজেটে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করছে ব্যবসায়ীদের এ সংগঠন। সেই সাথে দেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) কমানো ও সম্পূর্ণ পণ্য আমদানিতে শুল্ক অব্যহত রাখার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বিসিআইয়ের বাজেট প্রস্তাবনায় এ দাবি জানায় সংগঠনটি।

এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনায় বিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, সংগঠনের বাজেট সমন্বয়ক ও পরিচালক প্রকৌশলী শামসুর রহমান ও কয়েকজন পরিচালক এবং এনবিআরের বিভিন্ন বিভাগের সদস্য ও কর্মকর্তার উপস্থিত ছিলেন।

সংগঠনের প্রস্তাব উপস্থাপন করে বিসিআইয়ের পরিচালক ও বাজেট সমন্বয়ক মহব্বত উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে প্রায় সব শিল্পের ক্ষেত্রেই নিজস্ব উৎপাদন যোগ্য কারখানা রয়েছে। তবে দেশীয় কাঁচামাল থেকে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হয়। যার ফলে নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা থাকার পরও চাহিদা পূরণ করতে পারছেনা শিল্প সংশ্লিষ্টরা। তাই কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১০ শাতাংশ করা হলে বিনিয়োগ বাড়বে দেশীয় শিল্প ।

বাজেট আলোচনায় দেশীয় শিল্প রক্ষায় এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সম্পূর্ণ প্রস্তুতকৃত পণ্যে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন তিনি। এর মধ্যে মোটর সাইকেল, রেফ্রিজারেটর, গাড়ি, খাদ্য ও পানীয় পণ্য অন্যতম।

দেশীয় শিল্পের মধ্যে প্লাস্টিক ও খেলনা আইটেমের বিষয়ে তিনি বলেন, প্লাস্টিকের ক্রোকারিজ ও খেলনা আইটেমের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। দেশে বহু  ক্ষুদ্র যংন্ত্রাশ ব্যবহারকারী কারখানা গড়ে ওঠেছে। তাতে বিশ্বে প্লাস্টিক খেলনার বাজার তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। এ শিল্প বর্তমানে ভারত ও চীনের সাথে প্রতিযোগীতায় অংশ নিচ্ছে। তাই এ শিল্পকে প্রতিযোগিতার বাজারে টিকিয়ে রাখতে ও নতুন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকার কম মূলধনী প্রতিষ্ঠানকে সকল প্রকার কর থেকে মুক্ত রাখা দরকার। একই সাথে প্লাস্টিক ও খেলনার খুচরা যন্ত্রাংশ স্পিং, ফ্রিকশন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মিউজিক, আইটেম, বাতি আমদানির ক্ষেত্রে তা ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়।

এছাড়া পিভিসি পাইপ ও পিভিসি ক্যাবল তৈরির কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ১০ থেকে ৫ শতাংশ নামিয়ে আনার প্রস্তাব করে তিনি বলেন, এই কাঁচামালের ওপর থেকে শুল্কহার কমালে দেশীয় শিল্প প্রতিরক্ষণের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়বে।

এ সময় তিনি বলেন, দেশে মেলামাইন শিল্পের ৭০টির বেশি কারখানা রয়েছে। যেখানে  বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। তবে গত অর্থবছরে শুল্ক ২৫ শতাংশ করার কারণে মেলামাইন শিল্পসহ গোটা প্লাস্টিক সেক্টরে সংকট তৈরি হয়েছে।

দেশীয় খাদ্য উৎপাদনকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের দাবি করে তিনি বলেন, চিপস, বিস্কুট, চানাচুর, ওরস্যালাইন-সহ বিভিন্ন পণ্যের মোড়কের ওপর লেমিনেশনের জন্য পলিস্টাইরিন, ফিল্ম, পেট ফিল্ম ও বিওপিপি ফিল্ম ব্যবহার করা হয়। যা পণ্যের  গুণগতমান সংরক্ষণসহ আদ্রতা প্রতিরোধ করে। তাই শিল্পের স্বার্থে এই ধরণের পণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো দরকার। সেইসাথে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বিভিন্ন বিস্কুট সামগ্রীর ওপর আরও বেশি শুল্কারোপ করার দাবি জানান তিনি।

রেফ্রিজারেটর এর কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করে তিনি বলেন, বিদ্যমান শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে নামিয়ে এনে তা ১০ শতাংশ করা দরকার। একই সাথে বিদেশী রেফ্রিজারেটরে অধিক শুল্কারোপ করলে দেশে শিল্পায়ন আরও তরান্বিত হবে। আর্থিক কর্মসংস্থানের পথ সুগম হবে। আর তাতে বাড়বে সরকারি রাজস্ব।

গ্যাস জেনারেটরের ওপর থেকে সম্পূর্ণ শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করে তিনি বলেন, প্লাস্টিক খাতে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে  প্রাশয়ই কাঁচামাল নষ্ট হয়ে থাকে। যা অন্য শিল্পের ক্ষেত্রে ঘটে না।

এসময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে দেশে উৎপাদিত ছোটদের প্লাস্টিকের সামগ্রী থেকে মূসক কমানোর প্রস্তাব করে বলা হয়, ক্ষুদ্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে মূসক প্রত্যাহারের কোনো বিকল্প নেই । এ শিল্পের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বাড়ানোর ফলে হাজার হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এ শিল্পকে রক্ষায় প্লাস্টিক পণ্যের ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি করেন তিনি।

বাজেটে কর ও শুল্ক হারের বৈষম্য কমানোর দাবি করেন বিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু। এসময় তিনি বলেন, বাণিজ্যিক ও শিল্প আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হারের ভিন্নতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব সংরক্ষণ, নতুন শিল্প স্থাপন তথা অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। আর ফলে ব্যহত হচ্ছে রাজস্ব আয়ও।

তিনি আরও বলেন, করদাতাদের উৎসাহিত করতে বর্তমান কর ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা দরকার। এরমধ্যে সরকারি কোম্পানির কর ২০ শতাংশ ও বেসরকারি কোম্পানির কর ৩০ শতাংশ করা দরকার। আর কোম্পানির লভ্যাংশ আয় ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার দাবি করেন তিনি।

এছাড়া নূন্যতম কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ তুলে নেওয়ার দাবি করেন তিনি।

এসময় সংগঠনের পক্ষ থেকে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর মূসক প্রত্যাহারসহ পণ্য খালাস সংক্রান্ত নীতিমালা, পাওয়ার সেক্টর, ব্যাংকের বিভিন্ন চার্জ, পরিবেশ লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়ন সমস্যা, প্যাকেজিং সমস্যা, দক্ষ জনশক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এইউ নয়ন/সাকি