কর্পোরেট কর কমানোসহ একগুচ্ছ দাবি এমসিসিআইয়ের

MCCI NBRব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট করের হার পুনর্বিন্যাস ও তা কমিয়ে নিয়ে আসার প্রস্তাব করেছে মেট্রোপলিট্যান চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি (এমসিসিআই)। একই সাথে আগামি বাজেটে অলাভজনক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো ও ব্যক্তি শ্রেণীর করসীমা ২ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানান তারা।

রোববার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে এনবিআরের সাথে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় সংগঠনের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব করেন তারা। এসময় সংগঠনের পক্ষ থেকে  আয়কর সংক্রান্ত ৩৫টি, মূল্য সংযোজন কর সংক্রান্ত ১৪, শুল্ক সংক্রান্ত ৩০টিসহ মোট ৮৯টি প্রস্তাব করা হয়েছে।

এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেনের সভাপতিত্বে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এমসিসিআইয়ের মূল বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন সংগঠনটির সদস্য ও কর উপদেষ্টা আবিদ এইচ খান। এসময় এমসিসিআইয়ের সভাপতি রোকেয়া আফজাল, মহাসচিব ফারুক আহমদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সদস্য, প্রথম সচিব ও সংগঠনের অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন।

মূল প্রস্তাবনা তুলে ধরে সদস্য আদিব খান বলেন, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি এবং ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্পোরেট কর ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। যা পাশের দেশগুলো ও এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ভারতের কর্পোরেট কর ৩৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এটা ব্যাংক ও অব্যাংক জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহের জন্য প্রযোজ্য।  আর জীবন বিমা কোম্পানিসমূহের ক্ষেত্রে করের হার ১৫ শতাংশ। এরমধ্যে সারচার্জ ২ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণ বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৫ শতাংশ সারচার্জসহ কর্পোরেট কর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বে জাপানের কর্পোরেট কর সবেচেয়ে বেশি, ৩৮ শতাংশ। পাকিস্তানে এই করের হার ৩৭ শতাংশ।  বাকী বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। এরমধ্যে সিঙ্গাপুর, চীন ও হংকয়ে এ করের হার ২০ শতাংশেরও কম।

আর পাশের সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কর্পোরেট কর উচ্চ থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত পুন: বিনিয়োগের তহবিলের জমা হওয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই কর্পোরেট কর কমানোর জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অব্যাংক জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহে ফিক্সড ডিপোজিট বিনিয়োগ করার অনুমতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ তহবিল, আনুতোষিক তহবিল, বার্ধক্যজনিত তহবিল, অবসর ভাত তহবিলগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং অব্যাংক জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহে এফডি বিধি অনুযারী কন্ট্রিবিউশনের উপর বিনিয়োগ করার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।

করদাতার নেট সম্পদের ওপর সারচার্জ পুন: নিমির্ত করার প্রস্তাব করে তিনি বলেন, বিধান অনুযারী একজন করদাতাকে আয়কর ও সারচার্জ দিতে হয়। একজন করদাতার কর যোগ্য আয় নেই কিন্তু বিপুল পরিমাণ কর অব্যাহতি আয় আছে তাকে আয়কর বা সারচার্জ কোনটাই পরিশোধ করতে হয় না। তিনি সারচার্জ নেট পুন: নিমির্ত করার প্রস্তাব করেন। একই সাথে টার্নওভার আয়কর প্রত্যাহারের দাবি করেন।

কর অব্যাহতির সীমা উর্ধ্ব করার প্রস্তাব করে তিনি বলেন, জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় কর অব্যাহতির সীমা পুন: নিমির্ত করা প্রয়োজন। আগামি অর্থবছরে সাধারণ করদাতাদের জন্য কর অব্যাহতি সীমা  ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, মহিলা ও ৬৫ বছরের উর্ধ্বে পুরুষদের জন্য ৩ লক্ষ টাকা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেন।

সমুদ্রগামি জাহাজ আমদানির ওপর অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ প্রত্যাহার, জাহাজ কোম্পানির ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ কর প্রত্যাহার, জাহাজ মালিকদের রেমিটেন্সের ওপর নগদ কর ৩ শতাংশ প্রত্যাহারের দাবি করেন তিনি।

প্রস্তুত ইনফ্যান্ট ফমূর্লার শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রস্তুত আকারে ইনফ্যান্ট ফমূর্লার ওপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৫ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ আরোপ করা হয়েছে। তিনি এসব শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি করেন।

অপরদিকে অপরিণত ও স্বল্প জন্ম হওয়ার সময় ওজন ফমূর্লা, বাচ্চা ও কম বয়সী শিশুদের জন্য ডায়েরিয়া জনিত পণ্যের মতো ইনফ্যান্ট বিশেষায়িত পণ্যের আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি করেন। একই সাথে পূর্ণ ননীযুক্ত গুড়ো দুধ এফসিএমপি ও ননীযুক্ত গুড়ো দুধ এর ওপর আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন।

পার্টিকেল বোর্ডের আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব করে আদিব খান বলেন, দেশে ৯টি পার্টিকেল বোর্ড উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব পার্টিকেল বোর্ডের কাঁচামাল পাঠ খড়ি বাংলাদেশে পাওয়া যায়। কিন্তু অবাধ পার্টিকেল বোর্ড আমদানির ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠান পুঁজি হারানোর আশংকায় রয়েছে। এজন্য আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৫ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, এআইটি ৫ শতাংশ করা দরকার। একই সাথে দেশীয় পার্টিকেল বোর্ড ভ্যাট ও অন্যান্য শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাবও করেন তিনি।

স্বাদযুক্ত দুধ, চানাচুর, ভাজা ডাল বাদাম এর ট্রারিফ মূল্য নির্ধারণ পূর্বক তার ওপর উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে মূসক আদায়ের বিধানের প্রস্তাব করেন। একই সাথে মসকুয়েট কয়েল এর প্যাকেটের ওপর ব্যান্ডরোল পদ্ধতি চালু, সকল ভ্যাট সার্কেলে ভ্যাট রিটার্ন জমাদানে অটোমেশন পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করেন তিনি।

জন্মনিরোধক পণ্যাদির জন্য উৎপাদন ও কারবারি পর্যায়ের পরিবর্তে কেবলমাত্র আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহত, স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত শ্যাম্পুর ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারেরও প্রস্তাব করা হয়।

আলোচানায় বাজেট প্রস্তাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এমসিসিআই সভাপতি রোকেয়া আফজাল রহমান। এসময় তিনি তিনি বলেন, দেশের উৎপাদন খাত এখনো বিভিন্ন সমস্যার মোকাবেলা করছে। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ আমাদের উৎপাদনকে ব্যহত করছে। তাই আগামি বাজেটে শিল্প ও কৃষি খাতে অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার শক্ত নীতি প্যাকেজ রাখা দরকার।

এমসিসিআইয়ের প্রস্তাবনার জবাবে এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বলেন, আমরা খাত ভিত্তিক গুরুত্ব অনুযায়ী শুল্ক ও কর নির্ধারণ করে থাকি। একই সাথে দেশীয় শিল্পকে উৎসাহ প্রদানও আমাদের অর্থনীতির একটি বড় দিক। আপনাদের প্রস্তাবনা আমরা গুরুত্ব সহ ভাবছি। আপনাদের সাথে আলোচনা করেই একটি গণমুখী বাজেট প্রণয়ন করা হবে।

এইউ নয়ন